ভারতে বড়দিনে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ ও হয়রানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ
বড়দিন আনন্দ, শান্তি ও সৌহার্দ্যের উৎসব। ভারতের মতো বহুধর্মী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই উৎসব উদ্যাপন করা—প্রার্থনা সভা, ক্যারল গান, সাজসজ্জা, বা সাধারণ সামাজিক মিলন—কোনো “অনুগ্রহ” নয়; এটি নাগরিক অধিকার। সংবিধান নাগরিকদের ধর্মবিশ্বাস পালন ও উৎসব উদ্যাপনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। অথচ ২০২৫ সালের বড়দিনের সময়, একাধিক স্থানে খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের উৎসব-অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভাঙচুর, হুমকি ও বাধা দেওয়ার ঘটনা সংবাদ ও প্রতিবেদনগুলিতে উঠে এসেছে—যা গভীর উদ্বেগজনক।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছত্তিশগড়ের রায়পুরে একটি মলে বড়দিনের সাজসজ্জা ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে (International Christian Concern)। আসামের নলবাড়িতে একটি স্কুলে ঢুকে ন্যাটিভিটি দৃশ্যসহ বড়দিনের সাজসজ্জা নষ্ট করা ও কিছু সামগ্রী পোড়ানোর অভিযোগও উঠে এসেছে (International Christian Concern)। কেরালার পালাক্কাড়ে শিশুদের ক্যারল গানের দলের উপর হামলা এবং তাদের বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুরের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে (International Christian Concern)। বিভিন্ন সূত্র উদ্ধৃত করে ঘটনার একটি সারসংকলন ও সময়রেখাও পাওয়া যায় (Wikipedia)। একই সময়ে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হুমকি, মিথ্যা অভিযোগ ইত্যাদির পরিবেশ নিয়ে আলাদা প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে (Open Doors UK & Ireland)।
স্থানভেদে ঘটনার বিবরণ আলাদা হলেও, সার্বিকভাবে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট: সংখ্যালঘু ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানকে কিছু বেসরকারি গোষ্ঠী “অবৈধ” বা “অগ্রহণযোগ্য” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে, এবং কোথাও কোথাও তা জবরদস্তি ও সহিংসতার রূপ নিয়েছে। এটি কোনো “সংস্কৃতি রক্ষা” নয়; এটি ভয় দেখিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রে এই মনোভাব ও আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাংবিধানিক ও নাগরিক প্রশ্ন
আইনের শাসনে ধর্মীয় জীবনের “পুলিশিং” করার অধিকার কোনো জনতা বা উগ্র গোষ্ঠীর নেই। কোথাও যদি বেআইনি কাজের অভিযোগ থাকে—যেমন জোর করে ধর্মান্তর, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অন্য কোনো অপরাধ—তার একমাত্র বৈধ পথ হলো যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া: অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত। “ভিজিল্যান্টিজম” বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া—আইনের বিকল্প হতে পারে না, এবং একে নৈতিকতা বা দেশপ্রেমের মোড়কে বৈধতা দেওয়াও অনুচিত।
একই সঙ্গে, রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়ায় সীমিত থাকতে পারে না। পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো পূর্বানুমেয় উত্তেজনা বা হুমকির পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, এবং ভাঙচুর/হুমকি/হামলা হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ করা। যখন জনসমক্ষে উৎসব-অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হয় বা অভিযোগগুলি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয় না, তখন “সমান নাগরিকত্ব”-এর উপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।
কী করা প্রয়োজন
বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া কেবল সাধারণ বিবৃতি দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ:
- সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ এবং উপাসনা/উৎসব ব্যাহত করার ঘটনাগুলির স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের তরফ থেকে
- ভাঙচুর, বেআইনি জমায়েত, হুমকি ও হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত মামলা রুজু, অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ এবং আইনানুগ বিচারপ্রক্রিয়া
- যেসব ক্ষেত্রে পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও বাধা বা হিংসা রোধ হয়নি, অথবা অভিযোগ যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়নি—সেখানে প্রশাসনিক জবাবদিহি
- সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বড় উৎসবগুলির সময় সমান সুরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা-প্রটোকল, যাতে নিরাপত্তা রাজনৈতিক চাপ বা স্থানীয় পক্ষপাতের উপর নির্ভর না করে
শেষ কথা
এই প্রতিবাদ কেবল খ্রিস্টানদের জন্য নয়, কোনো একদিনের উৎসবের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি বৃহত্তর: ভারতের জনজীবন কি সংবিধান-নির্ধারিত সমান অধিকার ও আইনের শাসনে পরিচালিত হবে, নাকি ভয় ও বর্জনের ভিত্তিতে “অনুমোদিত” পরিচয়ই জনপরিসরের সীমা নির্ধারণ করবে?
ভারত কোনো একক পরিচয়ের রাষ্ট্র নয়; ভারত বহু পরিচয়ের সহাবস্থানের চুক্তি—যেখানে দ্বন্দ্ব মীমাংসা হবে আইন, অধিকার ও পারস্পরিক মর্যাদার মাধ্যমে। শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন যদি বাধার মুখে পড়ে—তাহলে তা “ঐতিহ্য রক্ষা” নয়; তা সংবিধান-প্রদত্ত বহুত্ববাদী চরিত্র থেকে সরে আসা।
অতএব দাবি একেবারে সরল ও দৃঢ়: সকল নাগরিককে সমভাবে রক্ষা করতে হবে, আইন প্রয়োগ করতে হবে পক্ষপাতহীনভাবে, এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি হুমকি ও হয়রানিকে কোনোভাবেই “স্বাভাবিক” হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না।